যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর উচ্চমানের বাড়তি সুবিধা বা রিওয়ার্ড মূলত ধনী ভোক্তাদের জন্য তৈরি। কিন্তু এর ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমবর্ধমান এসব সুবিধা এখন নতুন এক বৈষম্য তৈরি করছে। যেখানে ধনীরা আরো বেশি লাভবান হচ্ছেন, আর খরচের বোঝা বেড়েই চলেছে অন্যদের ওপর। খবর সিএনএন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব কনভেনিয়েন্স স্টোরসের (এনএএসসিএস) জেনারেল কাউন্সেল ডাগ ক্যান্টর বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলো এখন সবচেয়ে ধনী গ্রাহকদের সেবা দিতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তারা ধনীদের বাড়তি সুবিধা দেয় অন্যদের ব্যয়ভার বাড়িয়ে। কারণ এ বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত সবাইকেই বহন করতে হয়।’
চলতি বছর আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স) ও জেপি মরগান চেজ তাদের প্রিমিয়াম কার্ডে নতুন সুবিধা যুক্ত করেছে। অ্যামেক্স প্লাটিনাম কার্ডে এখন ওরা রিং কেনার জন্য ২০০ ডলারের ক্রেডিট (নির্দিষ্ট কেনাকাটায় অর্থছাড়) পাওয়া যায়। অন্যদিকে চেজ স্যাফায়ার রিজার্ভ কার্ডে উচ্চমানের হোটেল বুকিংয়ে সর্বোচ্চ ৫০০ ডলারের ক্রেডিট রয়েছে। দুটি কার্ডেই এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগসহ আরো নানা সুবিধা দেয়া হয়। তবে এ সুবিধার সঙ্গে বেড়েছে বার্ষিক ফিও। প্লাটিনাম কার্ডের ফি এখন ৮৯৫ ডলার এবং স্যাফায়ার রিজার্ভ কার্ডের ফি ৭৯৫ ডলার।
এ সুবিধাগুলোর অর্থ জোগান আসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা সোয়াইপ ফি থেকে। প্রতিবার ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের সময় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্ড কোম্পানিকে ফি দিতে হয়। এ ফির মধ্যে ইন্টারচেঞ্জ, প্রসেসিংসহ নানা খাতের চার্জ যুক্ত থাকে। জ্যাভলিন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড রিসার্চের ক্রেডিট অ্যাডভাইজরি সার্ভিসের পরিচালক ব্রায়ান রাইলি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে সোয়াইপ ফি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি। আর এ অর্থ দিয়েই এমন বিলাসবহুল রিওয়ার্ড ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়।’
এনএএসসিএস জানিয়েছে, কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে সোয়াইপ ফি প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা হয় মুনাফা কমাচ্ছেন, নয়তো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। এভাবে তারা বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপাচ্ছেন। ফলে ডেবিট কার্ড ব্যবহারকারীরাও পরোক্ষভাবে ক্রেডিট কার্ডধারীদের সুবিধার জন্য ব্যয়ভার বহন করছেন।
বোস্টন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জোয়ানা স্ট্যাভিনস বলেন, ‘নগদ ও ডেবিট কার্ড ব্যবহারকারীরা আসলে ক্রেডিট কার্ডধারীদের ভর্তুকি দিচ্ছেন। কারণ তারা একই দামে পণ্য কেনেন। কিন্তু কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পান না।’
ব্যাংক অব আমেরিকা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে উচ্চ আয়ের পরিবারের কার্ড ব্যয় নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় চার গুণ দ্রুত বেড়েছে।
ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ডেভিড টিনসলে বলেন, ‘আয়ের স্তরে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে, ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সে ফারাক স্পষ্ট। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে শীর্ষ ১০ শতাংশ আয়ের পরিবার থেকে, যা ১৯৮৯ সালের পর সর্বোচ্চ।’
এনএএসসিএস সোয়াইপ ফির প্রতিযোগিতা বাড়াতে ও ব্যবসায়ীদের কম খরচের পেমেন্ট নেটওয়ার্ক বেছে নেয়ার সুযোগ দিতে আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছে। তবে ২০২৩ সালে কংগ্রেসে প্রস্তাবটি আনা হলেও তা এখনো অগ্রগতি পায়নি।
জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির আইন অধ্যাপক টড জুইকি বলেন, ‘সোয়াইপ ফি সীমিত করা ঠিক হবে না। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রসার ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয়ের জন্যই সুফল এনেছে। এতে লেনদেন সহজ হয়েছে, নগদ টাকার ঝুঁকি কমেছে ও প্রতারণা প্রতিরোধে সহায়তা মিলছে।’
তবে গবেষণা বলছে, এ সুবিধা শুধু ধনীদের মধ্যেই সীমিত নয়। এতে ক্রেডিট স্কোরও বড় ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ ক্রেডিট স্কোরধারী গ্রাহকরা আয় যা-ই হোক না কেন অতিরিক্ত সুবিধাসংবলিত কার্ড থেকে লাভবান হন। অন্যদিকে নিম্ন স্কোরধারী উচ্চ আয়ের গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।